ব্রেকিং:
লক্ষ্মীপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৪তম জন্মদিন সোনাগাজীতে মাদকসেবীর হামলায় আহত ৩ জন হাসপাতালের টয়লেটে মিলল নবজাতকের লাশ প্রাইভেটকার উদ্ধারের ঘটনায় সেই ৩ ছিনতাইকারী গ্রেফতার সাউথ আফ্রিকায় নিজ দোকানে কর্মচারীর হাতে খুন ফেনী জেনারেল হাসপাতালে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা উপহার দেশে একদিনে ৩২ মৃত্যু, শনাক্ত ১২৭৫ ‘সিলেটে ধর্ষণের ঘটনায় কাউকে ছাড় দেয়া হবে না’ জবানবন্দি দিলেন এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গণধর্ষণের শিকার তরুণী উদ্বোধনের অপেক্ষায় হাওরের অলওয়েদার সড়ক একদিনে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু ভারতে স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি বন্ধে দুদকের ২৫ দফা বাস্তবায়ন নিয়ে রিট দাড়ি কেটে ছদ্মবেশে ভারতে পালানোর চেষ্টা করছিলেন ধর্ষক সাইফুর আপিল বিভাগেও জামিন পেলেন না ডেসটিনির এমডি সঙ্গী পরকীয়ায় জড়িয়েছে কিনা বুঝে নিন পাঁচ লক্ষণে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ: সভ্যতা ও মানবতার কালো অধ্যায় বাফুফেকে নিয়ে মানহানিকর কিছু লিখলেই মামলা ভ্যাকসিন সমান প্রাপ্তি নিশ্চিতের ওপর প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বারোপ সিঙ্গাপুর যেতে করোনা সনদ আর লাগবে না বিশ্ব নদী দিবস আজ
  • রোববার   ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||

  • আশ্বিন ১৩ ১৪২৭

  • || ০৯ সফর ১৪৪২

২৪

বাবা-ছেলের ফাঁদ যেন ‘একের ভেতর সব’, রয়েছে বিয়েও

নোয়াখালী সমাচার

প্রকাশিত: ৪ সেপ্টেম্বর ২০২০  

বাবা গোলাম মোহাম্মদ কালু ও ছেলে গোলাম মোস্তফা আদর ওরফে আলোক। গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ। প্রতারণাই যখন হাতিয়ার, তখন বিভিন্ন সব পন্থায় তাদের পদচারণা হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই বাদ যায়নি বাবা-ছেলে মিলে একাধিক বিয়ের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার ফাঁদও। এক কথায় বললে, প্রতারণার কৌশলে তারা যেন ‘একের ভেতর সব’!

প্রতারণার কৌশল হিসেবে তাদের ভুয়া যেসব পরিচয়:

ক্ষেত্র বিশেষ ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করে তারা। কখনো পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার আত্মীয়, কখনো মন্ত্রীর বন্ধু। আবার কখনো বড় ব্যবসায়ী, ব্যাংক ঋণ নিয়ে দেয়া, এক জমি একাধিকবার বিক্রি, সমাজের প্রভাবশালীদের নিকট আত্মীয়, গ্যাস সংযোগ নিয়ে দেয়া ও পুলিশ কর্মকর্তাদের ভালো জায়গায় পোস্টিং করে দেয়াসহ নানা পরিচয় রয়েছে প্রতারক বাবা-ছেলের। প্রভাবশালী পরিবার দেখে ছেলেকে একের অধিক বিয়ে করিয়েও হাতিয়ে নেয় কোটি কোটি টাকা। আর প্রতারণার এসব টাকা দিয়েই বিলাসী জীবনযাপন কাটাতো তারা।

সম্প্রতি তাদের প্রতারণার মুখোশ সামনে আসে। সবশেষ দু’জন সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের পরিবারকে জামিন করিয়ে দেয়া ও কৌশলে ব্ল্যাকমেইল করতে গিয়ে ধরা পরেন তারা।

প্রতারণার ফাঁদে তাদের টার্গেট যারা:

পুলিশে বদলী করিয়ে দেয়া, দীর্ঘদিন কারাবন্দিদের জামিন করিয়ে দেয়া, আবার কারাবন্দি ব্যক্তিদের স্ত্রী ও কন্যাদের কৌশলে ব্ল্যাকমেইল করে তাদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করে এই চক্র। জামিন করিয়ে দেয়ার নামে হাতিয়ে নেয় লাখ লাখ টাকা।  

সম্প্রতি গোলাম মোহাম্মদ কালু ও তার ছেলে গোলাম মোস্তফা আদর ওরফে আলোকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করে প্রায় একযুগ ধরে চালিয়ে আসা প্রতারণার কথা। সবশেষ দু’জন সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের পরিবারকে ফাঁদে ফেলে ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া তারা। এর মধ্যে ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ময়নুল হক মনজুকে জামিন করিয়ে দেয়ার কথা বলে তার স্ত্রী জাহানারা বেগম রেখার কাছ থেকে সাড়ে ১১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। স্বামীকে জামিন করিয়ে দেয়ার কথা বলে আরেকজন কারাবন্দি ওয়ার্ড কাউন্সিলরের স্ত্রীর কাছ থেকে নেয় সাড়ে ৮ লাখ টাকা। এখানেই ক্ষ্যান্ত থাকেনি প্রতারকরা। পরে ওই কাউন্সিলরের স্ত্রীকে ব্ল্যাকমেইল করতেও নতুন ফাঁদ পাতে তারা। 

জাহানারা বেগম রেখা জানান, দীর্ঘদিন ধরে স্বামী কারাবন্দি থাকায় তারা হতাশ হয়ে পড়েন। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের দিকে গোলাম মোস্তফা তার নম্বরে ফোন করে। এরপর সে জানায়, অনেক মন্ত্রী-এমপির সঙ্গে তার পরিচয়। মনজুকে জামিন করাতে অন্যদের তিন মাস লাগলে তার লাগবে তিন দিন। তবে জামিন করানোর বিনিময়ে ১৫ লাখ টাকা দিতে হবে। এরপর কয়েক দফায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা দেয়ার পরও জামিনের ব্যবস্থা হয়নি। এক পর্যায়ে তারা বুঝতে পারেন প্রতারকদের ফাঁদে পড়েছেন। 

জাহানারা বেগম আরো বলেন, একটি মার্কেটে তার নামে থাকা দোকান বিক্রি করে টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করছিলেন তিনি। পরে ওই মার্কেটের দলিল গোলাম মোস্তফা ও তার বাবা গোলাম মোহাম্মদ কালুকে দেখানো হয়। তাদের কাছে দোকান কেনার একাধিক পার্টি রয়েছে বলে কৌশলে তার কাছ থেকে দোকানের দলিল হাতিয়ে নেয়া হয়।
 
গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আরো জানা গেছে, এক যুগের বেশি সময় ধরে গোলাম মোহাম্মদ কালুর বৈধ আয়ের সোর্স নেই। তবে ধানমন্ডিতে পরিবার নিয়ে আলিসান ফ্ল্যাটে থাকে। চলাফেরা করে টয়োটার প্রিমিও মডেলের গাড়িতে। তাদের অবৈধ অর্থের উৎস এক জমি একাধিকবার বিক্রি, সমাজের প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ করে দেয়ার ফাঁদ। গ্যাসের সংযোগ নিয়ে দেয়ার কথা বলেও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই চক্র। আবার কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে ভালো জায়গায় পোস্টিং পাইয়ে দেয়ার কথা বলেও লাখ লাখ টাকা পকেটে ভরেছে আদর ও তার বাবা। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৮ সালে অনেক মানুষকে প্রতারিত করার পর আত্মগোপনে যায় কালু। বাবার কাছে পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় ছেলে। কিন্তু পরিশোধ করেনি এক টাকাও। ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় ২০১২ সালে নিজেদের বাড়ি নিলামে ওঠে। এরপর বাড়িছাড়া হয়ে দেনাদারদের টাকা পরিশোধ না করে পালিয়ে আসে ঢাকায়। বসবাস করতে থাকে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরে। এরপর বাবা-ছেলে প্রতারণার পেশাই বেছে নেয়। প্রথম দিকে নিজেদের আত্মীয়দের সঙ্গে প্রতারণা করত। নিলামের বাড়ি ও জায়গা কিনে দেয়ার কথা বলে এক আত্মীয়র কাছ থেকে কালু ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। 

উত্তরাতেও প্রতারণার ফাঁদ পেতে হত্যা করে আসিফকে:

২০১৫ সালে প্রতারক আদরের সঙ্গে আসিফ ইমরান নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক ছাত্রের পরিচয় হয়। আসিফের প্রকৌশলী বাবা আর শিক্ষিকা মা হজে চলে গেলে আসিফকে কৌশলে নারায়ণগঞ্জের লোকশিল্প জাদুঘর দেখানোর নাম করে আদর তার বাবা কালু এবং অপরাপর সহযোগীরা নিয়ে যায় নারায়ণগঞ্জে। আসিফকে বেদম প্রহারের পর টাকা না পেয়ে তাকে গলা টিপে হত্যা করে বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয় তারা। অজ্ঞাত হিসেবে ওই লাশকে উদ্ধার করে কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ। পরে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহযোগিতায় তাকে পোস্তাগোলা কবরস্থানে দাফন করা হয়। 

ঘটনার ঠিক দুই বছর পর ২০১৭ সাল:

ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেফতার এক আসামির মাধ্যমে পুলিশ এবং আসিফের বাবা নিশ্চিত হন কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশের উদ্ধার করা ওই লাশ আসিফের। দেড় বছর পর কবর থেকে হাড় উদ্ধার করে বাবা-মায়ের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে আসিফের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয় পুলিশ। দীর্ঘ তদন্তের পর সিআইডি পুলিশ অপহরণ করে হত্যাকাণ্ডের এ মামলার প্রধান আসামি হিসেবে গোলাম মোস্তফা আদর এবং তার বাবা গোলাম মোহাম্মদ কালুকে অভিযুক্ত করে ২০১৯ সালে চার্জশিট দাখিল করে। 

বিয়ে নিয়ে ফাঁদ:

জানা গেছে, আদর এখন পর্যন্ত চারটি বিয়ে করেছে। চারটি বিয়েই করেছে প্রতারণার ফাঁদ পেতে। এরইমধ্যে তিন স্ত্রী তাকে তালাক দিয়েছেন। দ্বিতীয় স্ত্রী আলিশা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। ফেসবুকে পরিচয়ের মাধ্যমে বড় ব্যবসায়ী সেজে আলিশাকে বিয়ে করে আদর। প্রেমের টানে আলিশা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে এসে ২০১৮ সালে বিয়ে করেন আদরকে। কিছু দিন পর আদরের প্রতারণার বিষয় জানতে পেরে তাকে তালাক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত যান আলিশা। 

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ডিসি মশিউর রহমান বলেন, বিভিন্ন পরিচয়ে অভিনব প্রতারণায় জড়িত এই চক্র। সমাজের প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে তারা অনেক মানুষকে নিঃস্ব করেছে। তারা অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির। জামিন করিয়ে দেয়া, পুলিশে বদলিও করে দেয়ার নামে টাকা হাতিয়ে নেয় বলে স্বীকার করে। এ চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

অপরাধ বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর