ব্রেকিং:
বৈশ্বিক সঙ্কটে নারীদের সুরক্ষা মতিঝিলে হবে ২৫ তলাবিশিষ্ট বঙ্গবন্ধু চা ভবন অতিরিক্ত ২ মাসের বেতন পাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পশু কোরবানির ব্যবস্থা করা হবে দেশের ৬৬০ ওসিকে কঠোর বার্তা ৪ হাসপাতালের তথ্য তলব দুদকের ১৪ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ ৩১ বছর পর এবার কাঁচা চামড়া রপ্তানি! ক`জন সমালোচক মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন? সাহারা খাতুনের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক দুর্নীতিবাজ যেই হোক ব্যবস্থা নিচ্ছি ত্রাণ বিতরনে বেগমগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ডিম খাওয়ার জন্য পালিত কন্যাকে পৈশাচিক নির্যাতন শ্রমিকলীগের উদ্যোগে বৃক্ষরোপন কর্মসূচী হাতিয়ায় পুলিশের এস.আই`সহ নতুন আক্রান্ত ৮ মোটরসাইকেল চোরচক্রের ৬ সদস্য আটক দেশে একদিনে আরো ৪১ মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৩৩৬০ মাটির ১১১ ফুট নিচে চলবে ট্রেন গ্রামই হবে আগামীর চালিকাশক্তি পোশাক শ্রমিকদের ৮৪ কোটি টাকার সহায়তা
  • শুক্রবার   ১০ জুলাই ২০২০ ||

  • আষাঢ় ২৭ ১৪২৭

  • || ১৯ জ্বিলকদ ১৪৪১

১৪২

বাঙ্গালির ঈদ উৎসবে ‘রমজানের ওই রোজার শেষে’র আগমন কিভাবে?

নোয়াখালী সমাচার

প্রকাশিত: ২৪ মে ২০২০  

'ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ', গানটি বাংলাদেশে রীতিমতো যেন ঈদ উৎসবের জাতীয় সঙ্গীত অথবা ঈদের দিনের আবহ সঙ্গীত হয়ে উঠেছেসন্ধেয় ঈদের চাঁদ দেখা গেছে এমন ঘোষণার সাথে সাথেই পাড়ায় মহল্লায় প্রথমেই শোনা যায় হৈ হুল্লোড়।

আর তার পরপরই টেলিভিশন ও রেডিওতে বাজতে শুরু করে এই গানটি। অনেকের কাছেই এই গানটি না বাজলে ঠিক ঈদ বলে মনে হয় না

এই অমর সঙ্গীতটির রচয়িতা এবং সুরকার আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। কাকতালীয়ভাবে, এ বছর পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের দিনটি পড়েছে ২৫ মে, বাংলা ১১ জ্যৈষ্ঠ- আমাদের জাতীয় কবির ১২১তম জন্মদিনে। চলুন এ উপলক্ষে জেনে নেই, অমর গানটির ইতিহাসঃ

 

গানটির সাথে জড়িয়ে আছে বাংলায় প্রথম ইসলামী গান রের্কডের ইতিহাস। বাংলা ভাষাভাষি মুসলিমরা যতদিন ঈদুল ফিতর উদযাপন করবে ততদিন অবচেতন মনে এ গানটি বেজে উঠবে তাদের অন্তরে। কেবল জনপ্রিয়তা নয় সমকালীন বাংলার মুসলিম নব জাগরণে নজরুল রচিত ইসলামী সংগীতের অবদান ছিল লক্ষণীয়।
 

যার উৎসাহ আর অনুপ্রেরণায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচনা করেছেন এই কালজয়ী ইসলামী সংগীতটি তিনি আর কেউ নন ভাওয়াইয়া গানের বরপুত্র প্রখ্যাত শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমেদ। ‘ও মন রমজানের ঔ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ,’ আব্বাস উদ্দিন আহমেদের কন্ঠে প্রথম রেকর্ড হয়েছিল।

অবশ্য এ গানটি রের্কড করতে বেশ কাঠখড় পোঁড়াতে হয়েছে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমেদকে। কাজী নজরুল ইসলাম গ্রামোফোন কোম্পানীতে যোগদান করেন ১৯২৮ সালে। শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের সাথে কবির যোগাযোগ হয় ১৯৩০ সালে ১৯৩২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে প্রথম বাংলার ইসলামী গান হিসেবে এই গানটি বাজারে বের হয় এবং ১৯৪৪ খিষ্টাব্দ পর্যন্ত একটানা বাজারজাত হতে থাকে।

 

আব্বাস উদ্দিন আহমেদের স্মৃতি চারণ থেকে এ প্রসঙ্গে তথ্য পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, “একদিন কাজীদাকে বললাম, কাজীদা, একটা কথা মনে হয় এই যে পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়াল এরা উর্দূ কাওয়ালী গায়, এদের গান শুনি অসম্ভব বিক্রি হয়, এই ধরেন বাংলায় ইসলামী গান দিলে হয় না?

তারপর আপনি তো জানেন, কিভাবে আপনাকে কাফের কুফর ইত্যাদি বলে বাংলার মুসলমান সমাজের কাছে আপনাকে অপাংক্তেয় করে রাখবার জন্য আদাজল খেয়ে লেগেছে একদল ধর্মান্ধ। আপনি যদি ইসলামী গান লেখেন তাহলে মুসলমানের ঘরে ঘরে আবার উঠবে আপনার জয় গান। ‘কথাটি তার মনে লাগলো। তিনি বললেন,‘ আব্বাস তুমি ভগবতী বাবুকে বলে তার মত নাও, আমি ঠিক বলতে পারি না”।

 

হিজ মাস্টারস ভয়েস কোম্পানীর রেকর্ডিং ইনচার্জ ছিলেন ভগবতী ভট্টাচার্য্য।  নজরুলের সম্মতির পর থেকে শুরু হয় আব্বাস উদ্দিনের অধ্যবসায়। তিনি ভগবতী ভট্টাচার্য্যকে প্রথম প্রস্তাব করেন দু’টি ইসলামি গান রেকর্ড করার জন্য। কিন্তু আব্বাস উদ্দিনের প্রস্তাবে সাড়া দেননি ভগবতী ভট্টাচার্য্য।

তখন কোলকাতায় হিন্দু রক্ষণশীল সমাজে শ্যামা সঙ্গীত, কীর্তন, ভজনের রমরমা বাজার, এ অবস্থা ভগবতীও ভাবেননি ইসলামি গান রেকর্ডিং করার কথা, তাছাড়া তখন মুসলমান সমাজের গান বাজনাও ছিল প্রায় নিষিদ্ধ। সে সময় কোচবিহারের উদীয়মান তরুণ জনপ্রিয় শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের বেশ কয়েকটি গান কোলকাতার বাজারে জনপ্রিয়, নজরুল ইসলামের গান প্রতিটি ঘরেই সমাদৃত। কিন্তু আব্বাস উদ্দিনের প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৯৩১ সালের নভেম্বর মাসে, আব্বাস উদ্দিন দ্বিতীয়বার ভগবতী ভট্টাচার্য্যকে প্রস্তাব করেন ২টি ইসলামি গান রেকর্ড করার জন্য। এবারে রাজি হন ভগবতী। তরুণ শিল্পী আব্বাস উদ্দিন একদৌড়ে এইচএমভি কোম্পানীতে কাজী নজরুল ইসলামের কাছে যান, তখন নজরুল ইন্দু বালাকে গানের সুর তুলে দিচ্ছিলেন। আব্বাস উদ্দিন বললেন, ‘কাজীদা ভালো খবর আছে। ভগবতী বাবু রাজী হয়েছেন দু’টো ইসলামি গান রেকর্ড করবেন।’

সেই থেকে শুরু। নজরুল ইন্দুবালাকে বিদায় দিয়ে তার আর্দালি দশরথকে চা ও পানের অর্ডার দিয়ে হারমোনিয়াম ও কাগজকলম নিয়ে বসেন। সৃষ্টি হয় বাংলার মুসলমানদের জন্য কালজয়ী বিখ্যাত গান ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’। দু’লাইন লেখেন আর সুর করে আব্বাসকে ধরিয়ে দেন।

এরপর আরো একটি গান ‘ইসলামের ওই সওদা লয়ে’ তাৎক্ষণিকভাবে রচনা ও সুর সংযোজনা করে আব্বাসের কণ্ঠে তুলে দেন। ১৯৩১ সালের ডিসেম্বরই গান দু’টি রেকর্ড করা হয়।

অপূর্ব সুর ও ছন্দে ইসলামি গান দু’টি সবার প্রশংসা অর্জন করে এবং ঠিক ২ মাস পর ১৯৩২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ এবং ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এলো নবীন সওদাগর’’ গান দু’টি বাজারে রেকর্ড করে ছাড়া হয়। হিজ মাস্টার ভয়েস এর এ রেকর্ডের নম্বর ৪১১১।

কেবল কোলকাতা নয়, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ে এ গানের ঢেউ। দেশবাসী, বিশেষ করে মুসলমানরা হতবাক ও বিস্মিত হন। ইসলামের শাশ্বতবাণী গানের মাধ্যমে এতোটাই জনপ্রিয় হলো যে, এইচএমভি কোম্পানি অন্যান্য গানের রেকর্ডে যে পরিমাণ বিক্রয়লব্ধ মুনাফা করত তার চেয়ে আরো বেশি লাভবান হতে শুরু করলো। তখন এইচএমভির ভগবতী ভট্টাচার্য্য আরো কিছু ইসলামি গান রেকর্ডের প্রস্তাব দেন, মুক্ত হয় বাংলা ভাষায় ইসলামি গানের এক নতুন জগত।

সে সময় আরো একটি অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে। ইসলামী গানের বাড়তি চাহিদার পাশাপাশি মুসলিম গায়কের সংকট দেখা দেয়, এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বী অন্যান্য গায়ক-গায়িকারা ইসলামী গানে মুসলমানী নাম ধারণ করে রেকর্ড করেন।

তাদের মধ্যে ধীরেন দাস-গনি মিয়া নামে, চিত্ত রায়-দেলোয়ার হোসেন, আশ্চার্যময়ী দাসী-আমিনা বেগম, গিরীন চক্রবতী-সোনা মিয়া, সীতাদেবী-দুলীবিবি অন্যতম।

আব্বাস উদ্দিন তার কন্ঠে ‘এই সুন্দর ফুল, সুন্দর ফল, মিঠা নদীর পানি খোদা তোমার মেহেরবানী’, ‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’, ‘আমি যদি আরব হতাম, মদিনারই পথ’সহ প্রায় ৭৪টি ইসলামি গান রেকর্ড করেন।

নজরুল গবেষক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, “সে সময়কার বাঙালী মুসলিম সমাজ এই গানটি তখন লুফে নিয়েছিল। অন্য এলাকায় মুসলিমরা গান করলেও বাঙালী মুসলিমের কাছে সঙ্গীত ছিল অপাঙতেও। কিন্তু এই গানটিতে ধর্মীভাবধারা আর ঈদের যে খুশি সেটা খুব চমৎকারভাবে ধরা পরেছে"সেই থেকে এই গানের শুধু উত্থানই হয়েছে। এমনকি অমুসলিম শিল্পী সতিনাথ মুখার্জি সহ আরো অনেকের কণ্ঠে শোনা গেছে গানটি।

আব্বাসউদ্দিনের ছেলে ও মেয়ে মুস্তাফা জামান আব্বাসি ও ফেরদৌসি রহমানও গানটি জনপ্রিয় করেছেন।

কিন্তু গানটিকে ধীরে ধীরে আরো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতার। ঈদের চাঁদ দেখা গেলেই এই গানটি বাজানোর একটি রীতি প্রচলন করেছে সরকারি এই দুটি সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান। অধ্যাপক রিফিকুল ইসলামের ভাষায়, "আব্বাস উদ্দিন মারা গেছেন ১৯৫৯ সালে। তার পরে এত বছর গানটি কারা গাইলো? আমরাইতো গাইলাম। আব্দুল আলিম, আব্দুল হালিম চৌধুরী, বেদার উদ্দিন আহমেদ, সোহরাব হোসেন, এদের নাম আমরা ভুলে যাবো কেন?" এই গানটি দিয়েই বাংলায় মুসলিমদের মধ্যে সঙ্গীতের জনপ্রিয়তার শুরু, শোনা ও চর্চার শুরু। নজরুলই তার সূচনা করেছেন। এরপর ইসলামের নানা দিক ও ঈদকে নিয়ে গান রচনার চেষ্টা আরো অনেকেই করেছেন কিন্তু তাতে এতটা সফল কেউই হননি