ব্রেকিং:
জাতীয় কবির ১২১তম জন্মদিন আজ বাঙ্গালির ঈদ উৎসবে ‘রমজানের ওই রোজার শেষে’র আগমন কিভাবে? একদিনে সর্বোচ্চ ২৮ জনের মৃত্যু, শনাক্ত আরও ১৫৩২ দেশবাসীকে আওয়ামী লীগের ঈদ শুভেচ্ছা ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ মেরামতের কাজ শুরু করেছে সেনাবাহিনী ২৮০ ট্রান্সজেন্ডার ও হিজড়াকে ঈদ সামগ্রী প্রদান ক্ষতিগ্রস্ত ৬ হাজার পরিবারকে ৩ কোটি টাকা সহায়তা দেবে ব্র্যাক ক্ষতিগ্রস্ত ৬ হাজার পরিবারকে ৩ কোটি টাকা সহায়তা দেবে ব্র্যাক ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত ঈদ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঈদের শুভেচ্ছা জানালেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী বহিরাগতরা হাতিয়ায়ঃ আতঙ্কে স্থানীয়রা ছাত্রলীগ নেতার ঈদ সামগ্রী বিতরণ কোম্পানীগঞ্জে স্ক্যান করে রিলিফ স্লিপ জালিয়াতি উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও থানাকে পিপিই প্রদান লকডাউন অমান্য করায় ১০ হাজার টাকা জরিমানা শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায়নি, ঈদ আগামি ২৫ মে দেশে ২৪ ঘণ্টায় নতুন শনাক্ত ১৮৭৩, মৃত্যু ২০ মসজিদে সর্বাধিক ঈদের জামাতের আয়োজন করোনা রোগীর চিকিৎসায় ৩ হাজার পদ সৃষ্টি
  • সোমবার   ২৫ মে ২০২০ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ১১ ১৪২৭

  • || ০১ শাওয়াল ১৪৪১

১০০

অর্থনীতি চাঙ্গার লড়াই শুরু; প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার প্রণোদনা

নোয়াখালী সমাচার

প্রকাশিত: ১৬ মে ২০২০  

করোনা ভাইরাস ব্যাপক বিস্তারের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি এখন বড় ধরনের বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বলে বিভিন্ন সংস্থা সতর্ক করে দিচ্ছে। করোনার এই প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। জীবিকা সচল রাখতে শিথিল করা হয়েছে লকডাউন। অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে সরকার। দেশের সব শ্রেণী পেশার মানুষের জন্য প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলোকে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সে অনুযায়ী অর্থ ছাড় শুরু করেছে অর্থ বিভাগ। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখা হচ্ছে আগামী বাজেটে। স্থবির অর্থনীতিতে প্রাণের সঞ্চার ঘটাতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নির্দেশনা দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। করোনা ইস্যুতে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ১০০ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। গঠন করা হয়েছে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকার পুনর্অর্থায়ন তহবিল। নিজস্ব তহবিল থেকেই এ অর্থের জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া করোনার পুরোটা সময়জুড়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে একদিনের জন্যও ব্যাংক বন্ধ রাখা হয়নি।

দুই বিশ্বযুদ্ধ দুনিয়ার অর্থনীতিকে যে সঙ্কটে ফেলেছিল, এবার এক করোনা ভাইরাসেই সেই সঙ্কটের দিকে নিয়ে গেছে বিশ্বকে। লকডাউন থাকায় এখনও স্থবির বহু দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশের শেয়ার ও তেলের বাজারে ধস নেমেছে। বছর শেষে প্রবৃদ্ধির হার কত কমবে, তাই নিয়ে এখনই শুরু হয়ে গেছে হিসাবনিকাশ। সব মিলিয়ে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে বিশ্ব। যদিও কিছু দেশ লকডাউন শিথিল করে অর্থনীতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। করোনা থেকে বাঁচতে বিলিয়ন-ট্রিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠন করছে বিশ্বের বহু দেশ। নতুন মুদ্রা ছাপিয়ে সরকারকে অর্থ যোগান দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলো। করোনার এমন সব প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। গত ২৬ মার্চ থেকে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। সরকারী ছুটি শুরু হওয়ার পর দাবি উঠেছিল কিছুদিনের জন্য ব্যাংক বন্ধ রাখার। কিন্তু সে দাবিতে কর্ণপাত না করে এখন পর্যন্ত একদিনের জন্যও ব্যাংক বন্ধ রাখতে দেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রণোদনা ভাতাসহ বড় অংকের বীমা সুবিধা দেয়া হয়েছে। এতে ঝুঁকি মাথায় নিয়েও গ্রাহকদের সেবা দিতে উৎসাহিত হয়েছেন ব্যাংকাররা। জীবিকা সচল রাখতে শিথিল করা হয়েছে লগডাউন বা সাধারণ ছুটি। অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে সরকার। গত মাসে দেশের সব শ্রেণী পেশার মানুষের জন্য প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর মধ্যে শিল্পঋণ খাতে ৩০ হাজার কোটি টাকা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা, কৃষি খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা, প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রেফারেন্স স্কিম নামে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ সুবিধা ও রফতানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ৫ হাজার কোটি টাকা রয়েছে। এছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নগদ সহায়তা ৭৬১ কোটি টাকাসহ ২১ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা দেয়া হয়। প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত গঠন করা হয়েছে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকার পুনর্অর্থায়ন তহবিল। নিজস্ব তহবিল থেকেই এ অর্থের জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সব মিলিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে অর্থনীতিতে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি নতুন ঋণ জোগানোর লক্ষ্য নিয়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে। স্থবির অর্থনীতিতে প্রাণের সঞ্চার ঘটাতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নির্দেশনা দিয়ে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। শুধুমাত্র করোনা ইস্যুতে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ১০০ প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এছাড়া করোনার মধ্যে বাজার থেকে পুরনো নোট তুলে নিয়ে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট ছাপিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের উল্লেখযোগ্য প্রজ্ঞাপনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়াতে ব্যাংকগুলোর নগদ জমা সংরক্ষণের হার (সিআরআর) ১ দশমিক ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেয়ার বিষয়টি। এই এক সার্কুলারে বাজারে বেড়েছে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার নগদ অর্থ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলো যাতে কম সুদে ঋণ পায় এ জন্য কমানো হয়েছে নীতি সুদহার (রেপো)। ৬ শতাংশ থেকে রেপোর সুদহার নামিয়ে আনা হয়েছে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশে। এতে কম সুদে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারছে ব্যাংকগুলো। এক প্রজ্ঞাপনে প্রণোদনা প্যাকেজগুলো বাস্তবায়নে মুদ্রা বাজারে তারল্য ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে শর্তসাপেক্ষে ৩৬০ দিন মেয়াদী বিশেষ রেপো (পুনঃক্রয় চুক্তি) প্রচলন চালু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ব্যাংকের হাতে থাকা অতিরিক্ত সরকারী সিকিউরিটিজ কিনে নেয়ার ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সহজে বিনিময়যোগ্য সম্পদ (এসএলআর) সংরক্ষণের পর অতিরিক্ত সরকারী সিকিউরিটিজ থাকলে তা প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বাজারমূল্যে বিক্রি করতে বলা হয়। বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলোর হাতে এসএলআরের অতিরিক্ত সরকারী সিকিউরিটিজ আছে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের সীমাও (এডিআর) ২ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর এডিআর ৮৫ থেকে ৮৭ শতাংশ এবং ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর আইডিআর ৯০ থেকে ৯২ শতাংশ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত সিআরআর, রেপো, সরকারী সিকিউরিটিজ ও এডিআরের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার মাধ্যমে ব্যাংকগুলো ব্যাপক মাত্রায় উপকৃত হয়েছে। এসব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো নিজে থেকেই ৭০-৮০ হাজার কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগ করার সুযোগ পেয়েছে। বেশি সুদের সরকারী বিল-বন্ড কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রেখে কম সুদে রেপোতে ঋণ পাচ্ছে। এর মাধ্যমেও ব্যাংকগুলো ভাল মুনাফা করতে পারছে।

এছাড়া দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঋণগ্রহীতাদের বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ ও সুদ পরিশোধের বিষয়ে এ ছাড় দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ঋণের অর্থ পরিশোধ না করলেও কোন ঋণগ্রহীতাকে খেলাপী করা হবে না। একই সঙ্গে এপ্রিল ও মে মাসের ব্যাংকঋণের সব সুদ স্থগিত থাকবে। এ দুই মাসের সুদ ব্লকড হিসাবে স্থানান্তর করতে হবে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এ সুদ কোনভাবেই গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোঃ সিরাজুল ইসলাম মনে করেন, সরকার যেসব প্যাকেজ ঘোষণা দিয়েছে, তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে তারল্যপ্রবাহ নিশ্চিত করছে। আবার একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি যাতে না হয়, সেদিকেও লক্ষ্য রাখছে। দেশের ব্যাংকিং সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত সরকার ঘোষিত সব প্রণোদনা প্যাকেজের নীতিমালাও দেয়া হয়েছে।

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বের প্রায় সব দেশেরই আমদানি-রফতানি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের রফতানি আদেশ বাতিল হয়েছে। তবে এখন নতুন ক্রয়াদেশ আসা শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালু করা হয়েছে তৈরি পোশাক কারখানা। রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি অর্জন ও অর্থনীতি সচল রাখতে অন্যান্য কারখানাও ধীরে ধীরে চালু হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে রফতানির অর্থ দেশে আনা ও আমদানি দায় পরিশোধের মেয়াদ বাড়িয়ে দ্বিগুণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১৮০ দিন বাড়ানো হয়েছে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির আওতায় স্বল্পমেয়াদী সাপ্লায়ার্স ও বায়ার্স ক্রেডিটের মেয়াদ। রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে নেয়া ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে ৯০ দিন। প্রি-শিপমেন্ট রফতানি সহায়তার জন্য গঠন করা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার পুনর্অর্থায়ন তহবিল। এ তহবিল থেকে ৩ শতাংশ সুদে ঋণ পাবে ব্যাংকগুলো। আর ব্যাংকগুলো গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে ঋণ দেবে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, রফতানি উন্নয়ন তহবিলের আকার ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে এ তহবিলের আকার ছিল সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার। এ তহবিলে সুদহার কমিয়ে ২ শতাংশে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। তহবিলে যুক্ত হওয়া দেড় বিলিয়ন ডলার বা ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানের জন্য গঠিত ইউরো গ্রীন ট্রান্সফরমেশন ফান্ডের আকার ২০০ থেকে বাড়িয়ে ৪০০ মিলিয়নে উন্নীত করা হয়েছে। কমানো হয়েছে এ ফান্ডের সুদহারও।

করোনার তা-বে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি খাতের জন্যও স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথমে মৌসুমভিত্তিক ফুল ও ফল চাষ, মৎস্য, পোল্ট্রি, ডেইরি, প্রাণিসম্পদ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার পুনর্অর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়। এ তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন গ্রাহকরা। একই সঙ্গে ধান, গমসহ সব দানা শস্য, অর্থকরী ফসল, শাকসবজি ও কন্দাল (আলু, কচু) জাতীয় ফসল চাষেও ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদে কৃষকদের ঋণ দেয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। করোনাভাইরাসে সৃষ্ট ক্ষতি থেকে দেশের কৃষকদের প্রণোদনা দেয়ার অংশ হিসেবে এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। গত ১ এপ্রিল থেকে কৃষকদের মধ্যে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এ স্কিমের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। এ হিসেবে কৃষি খাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভর্তুকির পরিমাণও ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ছাড়াবে।

ঘোষিত কোন প্রণোদনা প্যাকেজের মধ্যেই পড়ে না এমন নিম্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের জন্যও স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার পুনর্অর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। করোনাভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, কৃষক এবং প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের এ তহবিল থেকে ঋণ দেয়া হবে। ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বিতরণ করা এ ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার হবে ৯ শতাংশ। পরিবেশবান্ধব পণ্য বা প্রকল্পের জন্য গঠিত পুনর্অর্থায়ন তহবিলে অর্থের পরিমাণ দ্বিগুণ করা হয়েছে। ২০০ কোটি টাকার বিশেষ এ তহবিল উন্নীত করা হয়েছে ৪০০ কোটি টাকায়। এ তহবিল থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ পরিবেশবান্ধব পণ্য বা প্রকল্পে অর্থায়ন করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. আতিউর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, সরকারের নেয়া উদ্যোগগুলো যথাযথই বলতে হবে। তবুও আমাদের মনে রাখতে হবে, মধ্যমেয়াদী সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলোর বিচারে আমাদের অর্থনীতি বেশ খানিকটা হুমকির মুখেই আছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রবৃদ্ধি প্রক্ষেপণ অনুসারে কেবল বাংলাদেশ নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেই এ বছর প্রবৃদ্ধি দুই-তিন শতাংশের বেশি হবে না বলা হয়েছে। তবে আমার ধারণা-যদি এই দুর্যোগ আর খুব বেশি দীর্ঘায়িত না হয় এবং যদি সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায়, তাহলে আমাদের প্রবৃদ্ধি এর চেয়ে অনেক বেশি হবে। আমরা অতীতেও অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলায় নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ রেখেছি।

রফতানিকারকদের প্রণোদনার ৪০০ কোটি টাকা ছাড় করেছে অর্থ বিভাগ ॥ ঈদের আগ মুহূর্তে দেশীয় বস্ত্র, হিমায়িত চিংড়ি, অন্যান্য মাছ, চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত দ্রব্যসহ অন্যান্য খাতের রফতানিকারকদের জন্য প্রণোদনার ৪০০ কোটি টাকা ছাড় করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে তৈরি পোশাক রফতানির বিপরীতে দেয়া ১ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনার অর্থও রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুকূলে গত সোমবার এই অর্থ ছাড় করেছে। ছাড়কৃত অর্থের ভিত্তিতে হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (সিএজি) ডেবিট অথোরিটি জারি করবে। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক সময়ে সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ভর্তুকি দাবির বিপরীতে সরকারী হিসাব ডেবিট করে রফতানি প্রণোদনার অর্থ পরিশোধ করতে পারবে। তবে দাবি পরিশোধের পর নিরীক্ষায় প্রাপ্য অর্থের চেয়ে বেশি পরিশোধ হওয়ার কোন প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট গ্রহীতাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, রফতানিমুখী দেশীয় বস্ত্র, হিমায়িত চিংড়ি, অন্যান্য মাছ, চামড়াজাত পণ্যসহ অনুমোদিত অন্যান্য খাতে রফতানির বিপরীতে নগদ সহায়তা এবং পোশাক রফতানির বিপরীতে ১ শতাংশ হারে বিশেষ নগদ সহায়তা প্রদানের জন্য চতুর্থ কিস্তিতে ২৯৯ কোটি টাকা এবং পাট ও পাটজাত দ্রব্য রফতানিকারকদের জন্য চতুর্থ কিস্তিতে ১০১ কোটি টাকা ছাড় করা হয়।

পোশাক শ্রমিকদের বেতন দিতে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ছাড় ॥ করোনাভাইরাস সঙ্কটে শ্রমিকদের বেতন দিতে সরকার যে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল করেছে, সেখান থেকে এপ্রিল মাসের বেতন পেতে শুরু করেছেন শ্রমিকরা। এ পর্যন্ত আবেদন করা কারখানাগুলোর মধ্যে ২৫ শতাংশ কারখানার মালিক তাদের শ্রমিকদের বেতন দিয়ে দিয়েছেন। প্যাকেজের নীতিমালা অনুযায়ী, পোশাক কারখানাগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকগুলো ২ শতাংশ সহজ সুদে (সার্ভিস চার্জ) এই ঋণ বিতরণ শুরু করেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকগুলোর চাহিদা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ পর্যন্ত প্রণোদনা প্যাকেজের ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ছাড় করেছে। বাকি অর্থ দ্রুত ছাড় করা হবে। পোশাক কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের এপ্রিল মাসের বেতন-ভাতা দেয়ার জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি অর্থের জন্য আবেদন জমা পড়েছিল বলে জানান তিনি। মে ও জুন মাসের বেতন-ভাতার জন্য নতুন করে আবেদন করতে হবে জানিয়ে সিরাজুল ইসলাম বলেন, সেক্ষেত্রে যদি প্রণোদনা প্যাকেজের ৫ হাজার কোটি টাকায় না হয় সেটা সরকার বিবেচনা করবে। জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক বলেন, আবেদন করা কারখানাগুলোর মধ্যে ২৫ শতাংশ কারখানার মালিক তাদের শ্রমিকদের বেতন দিয়ে দিয়েছেন। আগামী সপ্তাহের মধ্যে বাকিদেরও বেতন দিয়ে দেয়া সম্ভব হবে।

চলতি বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৪ হাজার কোটি টাকা। তবে করোনা সঙ্কট মোকাবেলায় নতুন বাজেটে অন্তত ২৬ হাজার কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দিয়ে ১ লাখ কোটি টাকা করার দেয়ার চিন্তা ভাবনা করছে সরকার। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করা হবে ১ লাখ কোটি টাকা। এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য শামসুল আলম বলেন, অসমতা ও দারিদ্র্য দূর করতে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়াতেই হবে। এই খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিতে হবে। এখনও জিডিপির ২ শতাংশের কম বরাদ্দ দেয়া হয়। এটি অন্তত ৩-৪ শতাংশে উন্নীত করা উচিত। এ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অনুযায়ী দারিদ্র্য নির্মূল করতে হলে এসব গরিব মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা জোরদারে নজর দিতেই হবে।

করোনা ভাইরাস থমকে দিয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা। তবে এ সঙ্কট কাটিয়ে শীঘ্রই বাংলাদেশ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে, এ আশা নিয়েই চলছে নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ। ২০২০-২১ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে (এডিপি) বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে স্বাস্থ্য ও কৃষি খাত। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ যা চেয়েছিল, আসন্ন অর্থবছরে তার থেকেও বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে তারা। করোনাভাইরাস মোকাবেলাকে প্রধান্য দিয়ে আগামী অর্থবছরে ১২ হাজার ৭৩ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছিল স্বাস্থ্য খাত। কিন্তু তাদের জন্য বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে ১৩ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় নতুন অর্থবছরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নানা ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এ জন্যই এ খাতে বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। একইভাবে আগামীতে দেশে খাদ্য সঙ্কট মোকাবেলায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কৃষি খাত। দেশের মানুষ ও কৃষকরা যেন কোন ধরনের সঙ্কটে না পড়েন সে জন্যই এ খাতকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। নতুন অর্থবছরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের চাহিদা ছিল ২ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা। কিন্তু নতুন এডিপিতে তারা বরাদ্দ পাচ্ছে ৮ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে ড. আতিউর রহমান বলেন, অনেক প্রকল্প আছে, সেগুলো এক বছর পরে শুরু করলেও হয়ত খুব বড় ক্ষতি হবে না। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আমি বলব, এবারের বাজেট যেটা হবে, সেটা হবে স্বাস্থ্য বাজেট। পুরো চিত্রই হবে স্বাস্থ্য ঘিরে, অর্থনীতিও হবে স্বাস্থ্যকে ঘিরে। স্বাস্থ্য খাতের খোলনলচে বদলে ফেলার বাজেট আসবে আগামীতে। ঋণের ক্ষেত্রে ব্যাংক ব্যবস্থার উপর খুব বেশি নির্ভরশীল না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, কারণ তাতে ব্যক্তি খাতের জন্য ঋণ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হবে। এক্ষেত্রে আইএমএফ, এডিবি, বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো মহামারীর পরিপ্রেক্ষিতে যে ঋণ কর্মসূচী চালু করেছে, সেদিকে নজর দেয়ার পরামর্শ দেন আতিউর। বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্স ফেলো নাজনীন আহমেদ বলেন, মানুষের আয় ও খরচ বিবেচনায় নিয়ে করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকা করা উচিত। অনলাইন শিক্ষা প্রসারের জন্য ইন্টারনেটের খরচ কমাতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হিসাবে ‘ভ্যাকসিন ফান্ড’ করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলে সেটা গরিব মানুষের নাগালের বাইরে থাকতে পারে। এ কারণে গরিব মানুষকে ভর্তুকি দেয়ার প্রয়োজন পড়বে।

অর্থনীতি বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর